রিকশা চুরি ঠেকাতে অভিনব কৌশল

উজ্জল বিশ্বাস : চোর না শোনে ধর্মের কাহিনী, চুরি বিদ্যা বড় বিদ্যা যদি না পড়ে ধরা কিংবা চোরকে বলে চুরি করতে আর গৃহস্থকে বলে সজাগ থাকতে- এমন হাজারো প্রবাদ চালু আছে। গ্রামাঞ্চলে দেখা যায়, চুরি ঠেকাতে রাত জেগে পাহাড়া দেয় এলাকাবাসী। চোরের হাত নিজের সম্পদ রক্ষায় মানুষের চেষ্টার অন্ত নেই। আর রাজধানী প্রায়ই দেখা যায়, চুরি ঠেকাতে নিজের হাত কিংবা  পায়ের সঙ্গে শেকল বা রশি দিয়ে রিকশা বেধে রেখে ঘুমিয়ে থাকে চালকরা। আবার পরিশ্রমের পর ক্লান্ত শরীরকে একটু বিশ্রাম দিতে রিকশার ওপর ঘুমিয়ে থাকে অনেক চালক।

রিকশা
পায়ে শিকল বেধে ঘুমিয়ে আছে রিকশাচালক

রাজধানী ঢাকার পলাশী মোড় থেকে শহীদ মিনারের দিকে যেতে চোখে পড়লো- রিকশার চাকার সঙ্গে রশি দিয়ে পা বেধে দিব্যি ঘুমিয়ে আছেন ইসমাইল হাওলাদার। ঘুমানো সময় যাতে তার রিকশাটি চুরি না হয় সেজন্যই এ ব্যবস্থা। শুধু ইসমাইল নয়, রাজধানীতে তার মতো শত শত চালক রাতে কিংবা দিনে ঘুমানোর সময় রিকশার সঙ্গে নিজের পা কিংবা হাত বেধে রাখে। রিকশাই এ সব ছিন্নমূল মানুষের আবাসস্থল।

সারাদিন রিকশা চালানোর পর শরীর ক্লান্ত হয়ে পড়ে। গাছের ছায়ার নিচে বসে বিশ্রাম নিতেই চোখে নেমে আসে রাজ্যের ঘুম। কিন্তু রিকশা পাশে রেখে ঘুমিয়ে গেলেই বিপদ। কারণ ঘুমের সময় রিকশাটি চোরে নিয়ে যেতে পারে। আর রিকশা যাতে চুরি না হয় সেজন্য সতর্ক থাকতে হয়। ঘুমিয়ে থাকলে তো আর সতর্ক থাকা সম্ভব না। আবার অনেকে রিকশার ওপর ঘুমিয়ে থাকেন। কিন্তু রিকশার ওপর ঘুমালে পড়ে গিয়ে হাত-পা ভেঙ্গে যাওয়ার সম্ভাবনা থাকে। আর পড়ে গেলে আরামের ঘুম হারাম হতে পারে। তাই অনেকে রিকশা পাশে রেখে আরামে ঘুমিয়ে থাকে। আর তখনই রিকশাটি চুরি হয়ে যাওয়ার ভয় থাকে। এক্ষেত্রে রিকশার নিরাপত্তার জন্য চালক হাত কিংবা পায়ের সঙ্গে শেকল দিয়ে রিকশা রেধে রাখেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্যার সলিমুল্লাহ হলের সামনের রাস্তার পাশে রিকশার সঙ্গে হাতে শেকর বেধে ঘুমিয়ে ছিলেন রিকশাচালক ইসমাইল হাওলাদার (৩৮)। ঘুম থেকে ওঠার পর তার সঙ্গে কথা হয়। ইসমাইল হাওলাদার জানান, তার বাড়ি ফরিদপুরে। প্রায় চার বছর ধরে তিনি রাজধানীতে রিকশা চালান। স্ত্রী ও দুই সন্তান গ্রামের বাড়ি থাকে। রাজধানীতে তার থাকার নির্দিষ্ট কোন জায়গা নেই। রিকশা চালিয়ে প্রতিদিন তার গড়ে এক হাজার টাকা আয় হয়। আর মালিককে প্রতিদিন চারশ দিতে হয়। প্রতিদিন গড়ে তার ছয়শ থেকে সাড়ে ছয়শ টাকা থাকে। রাতদিন রিকশাটি তিনি সঙ্গে রাখেন। দিনের বেলা রিকশা চালাতে চালাতে ক্লান্ত হয়ে পড়লে রাস্তার পাশে হাতের সঙ্গে শেকল দিয়ে রিকশা বেধে ঘুমিয়ে নেন। ঘুম থেকে উঠে আবার রিকশা চালান।

তিনি আরো জানান, রাস্তার পাশের সস্তা ভাতের দোকান থেকে প্রতিদিন তিনবার ভাত খান। রাতে কোনো ভবন নিচে কিংবা ফুটপাতের পাশে ঘুমিয়ে থাকেন। আর ঘুমের সময় যাতে রিকশা চুরি না হয় সেজন্য রিকশাটি শেকল দিয়ে বেধে রাখেন। সকাল হলে আবার রিকশা চালানো শুরু করেন। এভাবেই রাজধানীতে তার চার বছর কেটে গেছে। তার মতো শত শত চালক রাতে কিংবা দিনে ঘুমানোর সময় রিকশা শেকল দিয়ে বেধে রাখেন।

কথায় আছে- বিশ্রাম আর কাজের অংশ এক সাথে বাধা নয়নের অংশ যেন নয়নেই পাতা। মানুষ দির্ঘ সময় কাজ করলে ক্লান্ত হয়ে পড়ে। তাই কাজের মাঝে তাকে বিশ্রাম নিতে হয়। রিকশাালক থেকে শুরু প্রত্যেকের উচিত এক নাগাড়ে কাজ না করে মাঝে মাঝে বিশ্রাম নেওয়া। তাহলে শরীর সুস্থ থাকবে। আর শরীর সুস্থ না থাকলে কারও পক্ষে কাজ করা সম্ভব না। আবার সুস্থ শরীরের জন্য সুষম খাবার খেতে হবে। কারণ রিকশা চালানো অনেক পরিশ্রমের।

 

লেখক : সহ-সম্পাদক

দৈনিক ইত্তেফাক

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Show Buttons
Hide Buttons
%d bloggers like this: