বজ্রপাত রোধে তালগাছ রোপন এবং আমাদের করনীয়

উজ্জল কুমার বিশ্বাসঃ বৈশিক উষ্ণায়নের এই যুগে বিভিন্ন প্রাকৃতিক দূর্যোগ মানুষের স্বাভাবিক জীবনযাত্রাকে ব্যহত করছে। অতিবৃষ্টি, ক্ষরা, ঝড়, তাপমাত্রা বৃদ্ধি ইত্যাদি প্রাকৃতিক দূর্যোগ যেমন মানুষের পরোক্ষ প্রভাবে হচ্ছে, তেমনি অনেক প্রাকৃতিক দূর্যোগও হচ্ছে যেখানে মানুষের কোন নিয়ন্ত্রণ নেই এবং কোন পূর্বাভাসও পাওয়া যায় না। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য প্রাকৃতিক দুর্যোগ হলো ভূমিকম্প এবং বজ্রপাত। ভৌগোলিক অবস্থানের কারনে বাংলাদেশ কম ভূমিকম্প প্রবণ এলাকা এবং কখনও ভূমিকম্প হলেও ক্ষয়ক্ষতির মাত্রাও কম হয়।

তবে বর্তমানে কালবৈশাখী-ঘূর্ণিঝড়, বন্যা-জলোচ্ছ্বাস, ভূমিকম্প-অগ্নিকাণ্ডের সঙ্গে নতুন দুর্যোগ হিসেবে যুক্ত হয়েছে বজ্রপাত। বজ্রপাত এদেশে ক্রমশ মারাত্মক রুপ ধারন করছে। দেশে বজ্রপাতের ঘটনা আগের চেয়ে বেড়েছে। গত বছর দেশে বজ্রপাতে নিহত হয়েছেন প্রায় ৪৬০ জন মানুষ। এর মধ্যে একদিনেই মারা যান ৮২ জন। বিষয়টি তখন সংবাদমাধ্যমসহ সর্বত্র ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়। এসব মৃত্যুর ঘটনায় বিষয়টি সরকারকে বেশ ভাবিয়ে তুলেছে। সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয় এটিকে নতুন দুর্যোগ হিসেবে চিহ্নিত করে ব্যাপক আলোচনা ও পর্যালোচনা করেছে। কিভাবে এ দূর্যোগ হতে মানুষকে রক্ষা করা যায় তা নিয়ে চলছে বিস্তর আলোচনা। এবছরও গত তিনমাসে বজ্রপাতে প্রায় ৩০০ মানুষ মারা গেছে। অধিকাংশ মানুষই মাঠে বা ফাঁকা জায়গা যেখানে কোন গাছপালা নেই এমন স্থানে মারা গেছে।

বজ্রপাত এক ধরণের বিদ্যুৎ রশ্মি। বেশি বেশি এবং উচুঁ গাছপালা থাকলে বজ্রপাতের ওই রশ্মি গাছ হয়ে তা মাটিতে চলে যায়। এতে জনমানুষের তেমন ক্ষতি হতো না। দেশব্যাপী বনায়ন হলেও তা আকারের দিক থেকে বড় হয়ে ওঠেনি। একটা সময় গ্রামে প্রচুর তালগাছ দেখা যেত। সরকারি পর্যালোচনায় দেখা গেছে, দেশের প্রায় সর্বত্রই তালগাছসহ বড় বড় গাছের সংখ্যা আগের তুলনায় অনেক কমে এসেছে। জনমনে প্রচলিত আছে, আগে বজ্রপাত হলে তা তালগাছ বা অন্য কোনও বড় গাছের ওপর পড়তো। কিন্তু গ্রামের পর গ্রাম ঘুরলেও এখন আর তাল গাছ দেখা যায় না। একইভাবে বড় আকারের গাছও এখন আর তেমন নেই। মূলত এ কারণে বজ্রপাতে অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুর সংখ্যা বৃদ্ধি পাচ্ছে। তাছাড়া বজ্রপাতের আগাম পূর্বাভাস পাওয়া যায় না।

তাই বজ্রপাতের মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগ প্রতিরোধে দেশব্যাপী তালগাছের চারা রোপণের উদ্যোগ নিয়েছে সরকার। ইতোমধ্যেই সরকারি উদ্যোগে ১০ লাখ তালগাছের চারা রোপণ করা হয়েছে। দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, নারিকেল গাছের চারা রোপণেরও পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। বিশেষজ্ঞদের অভিমত, গ্রামেগঞ্জে প্রচুর পরিমাণে তালগাছ ও নারিকেল গাছ থাকলে সেগুলো বজ্র নিরোধক হিসেবে কাজ করতে পারে। এর ফলে বজ্রপাতে নিহত হওয়ার ঘটনা এড়ানো যাবে ।

বজ্রপাতের সময় শিক্ষার্থীদের নিম্নোক্ত করনীয় বিষয়ে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে আলোচনা করে তাদেরকে সচেতন করা যেতে পারে:

১. ঘন ঘন বজ্রপাত হলে পাকা ভবন বা দা্লানের নীচে আশ্রয় নেওয়া।

২. বজ্রপাত হলে বিদ্যুৎ লাইন থেকে দুরে থাকা।

৩. খোলা জায়গা, উচুঁস্থান ও বড় কোন গাছের নীচে আশ্রয় না নেওয়া। বড় গাছ থেকে কমপক্ষে ৪ মিটার দুরে থাকা।

৪. খোলা জানালা থেকে দুরে থাকা।

৫. বজ্রপাতের সময় ধাতব কল, সিড়ির রেলিং, পাইপ, ল্যান্ড লাইন, স্পর্শ করা যাবে না।

৬. বিদ্যুৎচালিত যন্ত্র স্পর্শ বা ব্যবহার না করা।

৭. পানি বিদ্যুৎ পরিবাহী। তাই পানি থেকে দুরে থাকতে হবে।

৮. বজ্রপাতের সময় গাড়ির ভিতরে ধাতব বস্তু না ধরা এবং গাড়িটিকে কংক্রিট ছাউনির নীচে নিয়ে যাওয়া।

৯. বজ্রপাতের সময় কানে আঙ্গুল দিয়ে বসে পড়তে হবে ,তবে মাটিতে শুয়ে পড়া যাবে না।

১০. বজ্রপাতের সময় রাবারের বুট বা জুতা পড়তে হবে। ভেজা চামড়ার জুতা বা খালি পায়ে থাকা বিপদজনক।

১১. বজ্রপাতের সময় ছাউনি বিহীন নৌকায় মাছ ধরা বিপদজনক।

১২. বজ্রপাতের সময় ছাতা ব্যবহার, সাতার কাটা , ঘুড়ি উড়ানো যাবে না।

১৩. বজ্রপাতের সময় মোবাইল ফোন বন্ধ রাখা।

১৩. বজ্রপাতে কেউ আহত হলে বৈদ্যুতিক শকে আহত ব্যক্তির মত চিকিৎসা করতে হবে।

 

জন্মগ্রহণ করলেই মরতে হবে। তবে বজ্রপাতের হাত থেকে বাচতে তালগাছ, নারিকেল গাছ রোপন সহ উপরোক্ত করনীয় মেনে চললে বজ্রপাতের ক্ষয়ক্ষতির হাত থেকে অনেকাংশেই রক্ষা পাওয়া সম্ভব।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Show Buttons
Hide Buttons
%d bloggers like this: