শ্রেণিকক্ষে অধিক সংখ্যক শিক্ষার্থীর পাঠদান কৌশল

উজ্জল কুমার বিশ্বাস: কার্যকর শিখন শেখানো পরিবেশ নিশ্চিত করতে সুষ্ঠু শ্রেণি কার্যক্রম পরিচালনার গুরুত্ব অপরিসীম। শ্রেণিকক্ষের আয়তনের সাথে শিক্ষার্থীর সংখ্যা সংগতিপূর্ণ হলে ব্যবস্থাপনার মান নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। কিন্তু শিক্ষার্থীর পুরোপুরি শিখন নিশ্চিত করা বহুলাংশে  ব্যাহত হয়। অথচ এর দায়ভার শিক্ষকের ওপর পরে। তাছাড়া শ্রেণিক্ক্ষে শিক্ষার্থীর সংখ্যা বেশি হলে একজন শিক্ষকের পরিকল্পনা অনুযায়ী শ্রেণিকার্যক্রম পরিচালনা চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়। অধিক সংখ্যক শিক্ষার্থীর শ্রেণিকার্যক্রম পরিচালনার এই কাজকে সহজতর করতে শিক্ষকগণকে নানাভাবে সহায়তা করা দরকার। বিশেষ করে অধিক শিক্ষার্থীর শ্রেণিকার্যক্রম পরিচালনা সংক্রান্ত কতিপয় দিক তাদের জানা জরুরি।

 

 

অধিক সংখ্যক শিক্ষার্থীর শ্রেণিকার্যক্রম পরিচালনার কতিপয় সমস্যা:

শিক্ষকের ক্ষেত্রে উদ্ভূত সমস্যা : কণ্ঠস্বর, শিক্ষার্থীর নাম, শৃঙ্খলা বিধান, দৃষ্টি সংযোগ, অবস্থান, নির্দেশনা প্রদান, জোড়ায় বা দলে কাজ প্রদান, মূল্যায়ন, মনোভাব ইত্যাদি।

শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে উদ্ভূত সমস্যা: সক্রিয়তা, পুরোপুরি শিখন ইত্যাদি।

শ্রেণিকক্ষে ভৌত অবস্থার ক্ষেত্রে উদ্ভূত সমস্যা: শ্রেণিবিন্যাস, আসন ব্যবস্থা, শিক্ষোপকরণ, শিশুবান্ধব পরিবেশ ইত্যাদি।

সময়ের যথাযথ ব্যবহারের ক্ষেত্রে উদ্ভূত সমস্যা: পরিকল্পনা প্রণয়ন, দলীয় কাজ, মূল্যায়ন্ ইত্যাদি।

 

Buy Now

 অধিক সংখ্যক শিক্ষার্থীর শ্রেণিকার্যক্রম পরিচালনায় শিক্ষকের ক্ষেত্রে উদ্ভুত সমস্যা সমাধানের কৌশল-

কণ্ঠস্বর:

♦ শ্রেণিকক্ষের আয়তন অনুযায়ী কণ্ঠস্বর ব্যবহার করা

♦ স্পষ্টভাবে কথা বলা

♦ কথা বলার স্বাভাবিক গতি বজায় রাখা

♦ স্বরের উঠানামা যথাযথভাবে করা

♦ প্রয়োজন অনুযায়ী জোরে কথা বলা

♦ একক, জোড়া বা দলের কাজ পরিবীক্ষণের সময় নিচু স্বরে কথা বলা

♦ সমগ্র শ্রেণিতে কথা বলার সময় উঁচুস্বরে কথা বলা

শিক্ষার্থীর নাম মনে রাখা:

♦  কিছুদিন সকল শিক্ষার্থীকে একই জায়গায় বসতে দেওয়া

♦ প্রতিদিন ৬-৭ জন শিক্ষার্থীর নাম মনে রাখার চেষ্টা করা

♦ সম্ভব হলে নেমকার্ড ব্যবহার করতে বলা

♦ শ্রেণিকক্ষের বিভিন্ন কাজে শিক্ষার্থীদের ব্যবহার করা

শৃঙ্খলা বিধান:

♦ কথা বলতে হাত তুলতে বলা

♦ অন্যের কথা মনোযোগ দিয়ে শোনা

♦ অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধা প্রদর্শন করা

♦ অন্যের কথা বলার সময় কোনোরকম ব্যাঘাত সৃষ্টি না করা

♦ অমনোযোগী হলে পাঠ সংশ্লিষ্ট প্রশ্নের উত্তর দিতে বলা

দৃষ্টি সংযোগ:

♦ এমনভাবে তাকানো যাতে সবাই মনে করে যে শিক্ষক আমার দিকে তাকিয়ে আছেন

♦ মুহূর্তের মধ্যে দৃষ্টিকে শ্রেণিকক্ষের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্ত ঘুরিয়ে আনা

♦ পাঠ উপস্থাপনের সময় দৃষ্টিকে এদিক ওদিক করা

অবস্থান:

♦ সকল শিক্ষার্থীর উদ্দেশ্যে কোনো কিছু উপস্থাপন করতে শ্রেণির সামনে দাঁড়ানো

♦ জোড়ায় বা দলের কাজ পরিবীক্ষণ করতে তাদের সামনে যাওয়া

♦ দলীয় কাজ উপস্থাপনের সময় শ্রেণির এক কোণে বসে থাকা

♦ বিশেষ প্রয়োজন ছাড়া চেয়ারে না বসা।

নির্দেশনা প্রদান:

♦ সকলকে মনোযোগী হতে বলা

♦ নির্দেশনা সকলের নিকট বোধগম্য হবে কিনা তা পূর্বেই চিন্তা করা

♦ সুস্পষ্ট ও সংক্ষিপ্ত নির্দেশনা দেওয়া

♦ প্রদানকৃত নির্দেশনা বুঝতে পেরেছে কিনা যাচাই করা

জোড়ায় বা দলে কাজ:

♦ দলীয় কাজ প্রদানের পূর্বে প্রয়োজনীয় উপকরণ সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া

♦ দলে প্রয়োজনীয় উপকরণ প্রদান করা

♦ দলীয় কাজ পরিবীক্ষণ করা

♦ পরিবীক্ষণে সরাসরি সহায়তা না করে মূল বিষয়ের প্রতি অধিক চিন্তা করার সুযোগ সৃষ্টি করা

♦ বিষয় এক হলে যে- কোনো এক দলের কাজ উপস্থাপন করতে দেওয়া এবং অন্যদের মিলিয়ে

নিতে বলা। কোনোটা বাদ পড়লে তা পরে সংযোজন করতে বলা

♦ বিষয়বস্তু এক না হলে পর্যায়ক্রমে সব দলের কাজ উপস্থাপন করতে দেওয়া

♦ সম্ভব হলে জায়গা পরিবর্তন করে জোড়ায় বা দলে কাজ প্রদান করা

মূল্যায়ন:

♦ শিক্ষার্থীদের নিজের কাজ নিজে মূল্যায়ন করতে দেওয়া

♦ একজনের কাজ অন্যকে মূল্যায়ন করতে দেওয়া

♦ একই ধরণের ভুল হলে ঠিক উত্তরটি বোর্ডে লিখে দেওয়া

♦ একটি বেঞ্চের সকল কাজ ঐ বেঞ্চের একজন নির্দিষ্ট শিক্ষার্থী দ্বারা সংগ্রহপূর্বক মূল্যায়ন করে

পুনরায় তার মাধ্যমে ফেরত দেওয়া

♦ এক জোড়া/ দলের কাজ অন্য জোড়া/ দলকে দিয়ে মূল্যায়নের ব্যবস্থা করা

♦ শিক্ষার্থীদের দ্বারা মূল্যায়নের সময় পরিবীক্ষণ করা।

ইতিবাচক মনোভাব:

♦ সকল শিক্ষার্থীর প্রতি সমান দৃষ্টি দেওয়া

♦ সবার ব্যক্তি স্বাতন্ত্র্যের প্রতি ইতিবাচক ধারণা পোষণ করা

♦ সব ধরণের প্রতিক্রিয়ায় গঠনমূলক মনোভাব পোষণ করা

♦ শিক্ষার্থীর সফল বা অসফল প্রচেষ্টায় উৎসাহ প্রদান করা

♦ সকলের সাথে সুসম্পর্ক স্থাপন করা

শিক্ষার্থীর ক্ষেত্রে উদ্ভুত সমস্যা সমাধানের কৌশল:

♦ একক বা জোড়ায় বা দলে কাজ করার সময় প্রত্যেকে ঠিকমতো অংশগ্রহণ করছে কিনা সেদিকে

সজাগ দৃষ্টি রাখা

♦ অংশগ্রহণে সক্রিয়তা না থাকলে সক্রিয় হতে উদ্বুদ্ধ করা

♦ দলে কাজ করার সময় কেউ চুপচাপ বসে থাকলে তাকে কাজে লাগাতে অন্যদের অনুরোধ করা

♦ পারগ শিক্ষার্থীর জন্য অতিরিক্ত কাজ পূর্বেই নির্ধারণ করে রাখা

♦ দলে সকলের সক্রিয়তা নিশ্চিত করতে প্রত্যেককে একটি করে নির্দিষ্ট ভূমিকায় (যেমন- দলনেতা, লেখক, সময় নির্ধারক) অভিনয় করতে দেওয়া

পুরোপুরি শিখন:

♦ শিখন শেখানো কার্যক্রমে সকলের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা

♦ সকলকে মূল্যায়ন প্রক্রিয়ায় সম্পৃক্ত করা। এ ক্ষেত্রে উত্তর এককভাবে বলতে বা লিখতে দিয়ে

নিজে অথবা শিক্ষার্থীদের মাধ্যমে মূল্যায়ন করার ব্যবস্থা করা

♦ ভুল হলে তাৎক্ষণিকভাবে তা সংশোধন করা। প্রয়োজনে উত্তর বোর্ডে লিখে দেওয়া

♦ পুনরায় শুদ্ধ করে লিখতে বা বলতে বা করতে দেওয়া

পাঠ পরিকল্পনা প্রণয়ন-শিখন শেখানো কৌশল নির্বাচনের ক্ষেত্রে:

♦ পাঠ উপস্থাপনের প্রতিটি স্পষ্ট করে লেখা

♦ শিক্ষার্থীদের সংখ্যা বিবেচনা করে যথাযথ শিখন শেখানো কৌশল নির্বাচন করা

♦ মূল্যায়নের জন্য সংক্ষিপ্ত অথচ কার্যকর পরিকল্পনা করা।

সময়ের ক্ষেত্রে উদ্ভুত সমস্যা সমাধানের কৌশল:

♦ শিক্ষার্থী সংখ্যা কম হলে সময়ের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করা সহজ হয়। কিন্তু বাংলাদেশে এমনটি প্রায় বিরল।ফলে শ্রেণিকার্যক্রম পরিচালনার ক্ষেত্রে সময় নিয়ন্ত্রনের বাইরে চলে যায়। এ ক্ষেত্রে শ্রেণির সকল শিক্ষার্থী যাতে একটি পিরিয়ডের পুরো সময় ব্যবহার করতে পারে সে বিষয়টি গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করা উচিত।

পাঠ পরিকল্পনা প্রণয়ন:

♦ পরিকল্পনা প্রণয়নে পাঠ পরিকল্পনার প্রতিটি ধাপের জন্য সম্ভাব্য সময় নির্ধারণ করা

♦ সময়ের প্রতি লক্ষ রেখে শিখন শেখানো কাজের সমন্বয় করা

♦ প্রত্যেক শিক্ষার্থীকে প্রতিটি মুহূর্তে ব্যস্ত রাখার যথাযথ কৌশল নির্বাচন করা

দলীয় কাজ:

♦ স্বল্প সময়ে দল গঠনের জন্য সহজ কৌশল ব্যবহার করা

♦ যথাসময়ে দলীয় কাজ শেষ করতে উৎসাহিত করা

মূল্যায়ন:

♦ মূল্যায়নে সময়ের যথাযথ ব্যবহার নিশ্চিত করতে মূল্যায়নের পূর্বপরিকল্পনা করা

♦ সকলের শিখন নিশ্চিত করতে অপারগ শিক্ষার্থীর নিরাময়ে পারগ শিক্ষার্থীদের ব্যবহার করা

♦ উদ্দেশ্যভিত্তিক মূল্যায়ন করা

শ্রেণিকক্ষে ভৌত সুবিধার ক্ষেত্রে উদ্ভুত সমস্যা সমাধনের কৌশল:

শ্রেণিবিন্যাস:

♦ শারীরিক সমস্যা আছে এমন শিক্ষার্থীদের সামনে বসানো

♦ অপেক্ষাকৃত বড় শিক্ষার্থীদের শিক্ষকের  দিক থেকে একেবারে ডানে বা বামে বসানোর ব্যবস্থা করা

আসনব্যবস্থা:

♦ এক বেঞ্চের শিক্ষার্থীদের ঘুরে বসে অন্য বেঞ্চের শিক্ষার্থীদের সাথে দল গঠন করা

♦ পাশাপাশি বসা শিক্ষার্থীদের দিয়ে জোড়া গঠন করা

♦ সামনে পেছনের দু বেঞ্চের দু জন শিক্ষার্থীকে মুখোমুখি বসে জোড়া গঠন করা

♦ একই বেঞ্চের সকল শিক্ষার্থীকে দিয়ে একটি দলর গঠন করা

শিশুবান্ধব পরিবেশ:

♦ শিক্ষার্থীর সঙ্গে বন্ধুসুলভ ব্যবহার করা

♦ শ্রেণিকক্ষে অপ্রয়োজনীয় কাগজ ফেলার জন্য ঝুড়ি রাখা

♦ শ্রেণিকক্ষ পরিষ্কার রাখতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা করা

♦ শ্রেণিকক্ষে বই কর্নার ও উপকরণ কর্নার স্থাপন করা

শিক্ষোপকরণ:

♦ চকবোর্ড এমন উচ্চতায় করা যাতে ‍শিক্ষার্থীরা অনায়াসে তা ব্যবহার করতে পারে

♦ চকবোর্ড যথাযথ নিয়মে ব্যবহার করা

♦ দেওয়াল চিত্রগুলো প্রয়োজন অনুযায়ী পাঠে সম্পৃক্ত করা

♦ পাঠ সংশ্লিষ্ট আকর্ষণীয় উপকরণ ব্যবহার করা

♦ সহজলভ্য ও স্বল্পব্যয়ী উপকরণ ব্যবহার করা

♦ শিক্ষার্থীদের উপকরণ হিসেবে ব্যবহার করা

♦ প্রয়োজনে পাঠ্যপুস্তকের ছবি চিত্র ব্যবহার করা।

বাংলাদেশের সার্বিক অবস্থা বিবেচনায় সহসাই শ্রেনিকক্ষের শিক্ষার্থীর সংখ্যা কমানো সম্ভব নয়। যদিও দেশের জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার বর্তমানে বেশ কমেছে তথাপিও অবকাঠামো সহ অন্যান্য অনেক সমস্যার জন্য শ্রেণিতে অধিক সংখ্যক শিক্ষার্থী আছে। তাই তাদের কার্যকর শিখন নিশ্চিতে বিভিন্ন কৌশল প্রয়োগ করার বিকল্প নেই।

 

 

 

 

 

 

 

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Show Buttons
Hide Buttons
%d bloggers like this: