স্টিফেন হকিং -অক্ষমতাকে জয় করেছিলেন যে মহাবিজ্ঞানী

স্টিফেন হকিংঅক্ষমতাকে জয় করেছিলেন যে মহাবিজ্ঞানী

খুবই সুশিক্ষিত একটি পরিবারে জন্ম তাঁর। বাবা এবং মা দুজনেই ইংল্যান্ডেরবিশ্ববিদ্যালয় থেকে ডিগ্রী প্রাপ্ত হন। হকিংয়ের বাবা ফ্র্যাঙ্ক হকিং ছিলেন একজন চিকিৎসা বিজ্ঞানী আর মা ছিলেন রাজনীতির সাথে জড়িত। বাবা চেয়েছিলেন হকিং বড় হয়ে চিকিৎসক হোক। স্টিফেনের অংক এবং বিজ্ঞান এর প্রতি প্রচুর আগ্রহ থাকাতে ছোটবেলাতেই তার নিকনেম হয়ে যায়আইনস্টাইন ছেলেবেলা থেকেই হকিংয়ের আগ্রহ বিজ্ঞানে আর গণিতে। হকিং গণিত পড়ার জন্য অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ইউনিভার্সিটি কলেজে ভর্তি হতে যান কিন্তু যেহেতু সেখানে গণিতের কোর্স পড়ানো হতো না, সেই জন্য হকিং পদার্থবিজ্ঞান বিষয় নিয়ে পড়া শুরু করেন। সে সময়ে তার আগ্রহের বিষয় ছিল তাপগতিবিদ্যা, আপেক্ষিকতা এবং কোয়ান্টাম বলবিদ্যা। পড়াশুনা তার কাছে খুব সহজ মনে হতো। প্রচুর অবসর সময় থাকাতে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের বোট ক্লাব এবং উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের ক্লাবে ভর্তি হন।

এক সময় শরীরের সমস্যা শুরু হয় স্টিফেনের। তখন তাঁর মাত্র ২১ বছর বয়স। ডাক্তাররা জানান তিনি আর মাত্র কয়েক বছর বেঁচে থাকবেন। গ্রাজুয়েশন শেষ করার পর যখন স্টিফেন হকিং কেম্ব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ে যান পিএইচডি করতে তখন তার অসুখ ধরা পড়তে শুরু করেছে। প্রথম দিকে স্টিফেন খুবই হতাশায় ভুগছিলেন। তারপর একসময় তিনি ঘুরে দাড়ালেন এবং ভাবলেন, তাঁর অসমাপ্ত কাজগুলো শেষ করে যাবেন। তিনি খুবই কঠিন পরিশ্রম করতে শুরু করলেন। মৃত্যুর আগেই তাঁর পিএইচডি শেষ করতে চাইলেন। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে তিনি অনুরোধ জানান পিএইচডির কাজের দুই বছরের মাথায় তার থিসিস পরীক্ষা করে তাঁর ভাইভা বা মৌখিক পরীক্ষা নিতে। কারণ এর বেশী সময় তিনি বেঁচে থাকবেন না। বিশ্ববিদ্যালয়ের কঠিন নিয়ম ছিলো, কেউ তিন বছরের আগে পিএইচডি শেষ করতে পারবে না। এই কঠিন নিয়ম থাকা সত্ত্বেও কর্তৃপক্ষ তাঁর ভাইভা নিতে রাজী হন। কিন্তু কথা জড়িয়ে আসতে শুরু করে তাঁর। হাত থেকে জিনিস পড়ে যেত তাঁর এবং তিনি নিজেও পড়ে যেতেন। অনেক পরীক্ষা নিরীক্ষার পর ডাক্তাররা বুঝতে পারেন যে তার একটি অসুখ হয়েছে যার নাম এএলএস (ALS – also called Lou Gehrig’s disease) ২২ বছর বয়সে তিনি রোগে আক্রান্ত হন। মোটর নিউরন রোগের একটি বিশেষ ধরন অ্যামিওট্রপিক লেটারেল স্কেলরোসিসে (এএলএস) আক্রান্ত হয়েছিলেন তিনি। কারণে স্নায়ুর স্বাভাবিক প্রবাহ ব্যাহত হয়ে যায়। একই সময়ে তাঁর Jane Wilde এর সাথে তার পরিচয় হয় এবং তিনি তাঁর প্রেমে পড়েন। তাঁর কাজ এবং জেন এই দুটো ব্যাপার নিয়ে বেঁচে থাকতে চাইলেন তিনি। নিয়তি হকিংয়ের সঙ্গে নিষ্ঠুর আচরণ করেছে। তার পুরো জীবনই কেটেছে হুইলচেয়ারে। ধরা হয়েছিল রোগে আক্রান্ত হকিং মাত্র সামান্য কিছুদিন বাঁচবেন। কিন্তু সবাইকে অবাক করে দিয়ে তিনি টানা ৫৪ বছর বাঁচেন।

স্টিফেনের পুরো শরীরের মধ্যে মাত্র ৩টি আঙ্গুল কর্মক্ষম ছিলো। সেই তিনটি আঙ্গুল দিয়েই তিনি স্পিচ সিনথেসাইজার পরিচালনা করতেন। পক্ষাঘাতগ্রস্ত হয়েও কম্পিউটার স্পিচ সিনথেসাইজারের মাধ্যমে কথা বলতেন তিনি। সাধারণ বা স্বাভাবিক মানুষের সাথে কথা বলার এটাই ছিলো তাঁর মাধ্যম। শারীরিক অক্ষমতা তাকে রুখতে পারেনি। এই অক্ষমতাকে মাঝে মাঝে তিনি তাঁর সুবিধার দিক বলে ভাবতেন। কারণ এই জগতের স্বাভাবিক মানুষের কোন কাজ তাঁকে করতে হতো না। তাঁর সব দৈনন্দিন কাজ করতেন নার্স এবং অন্যান্য কর্মীরা। যার ফলে তাঁর মাথাতে একটাই মাত্র বিষয় জায়গা দখল করে থাকততা হলো বিজ্ঞান। থেমে ছিলো না হকিংয়ের তাত্ত্বিক পদার্থবিজ্ঞান নিয়ে গবেষণা। মহাবিশ্বের সৃষ্টি রহস্যের তাত্ত্বিক ব্যাখায় ব্লাক হোল আর এমন এক বিকিরণতত্ত্বের ব্যাখা দিয়েছিলেন স্টিফেন হকিং। যা তাকে পদার্থবিজ্ঞানের বর্তমান সময়ের শ্রেষ্ঠ বিজ্ঞানীর মর্যাদার আসন এনে দিয়েছে। আইনস্টাইনের পরেই হকিংকে বিখ্যাত পদার্থবিদ হিসেবে গণ্য করা হয়। ব্ল্যাক হোল থিয়োরির জনক তিনি। শুধু তাই নয়, তিনি সৃষ্টি রহস্যের অনেক অজানা দ্বার আমাদের জন্য উন্মুক্ত করে দিয়েছেন। পদার্থবিদ্যার ইতিহাসে অন্যতম সেরা তাত্ত্বিক হিসেবে বিবেচনা করা হয় স্টিফেন হকিংকে।

মহাবিশ্বের অজানা বিষয়গুলো নিয়ে সব সময় উৎসুক ছিলেন তিনি। কেমব্রিজ বিশ্ববিদ্যালয়ের লুকাসিয়ান অধ্যাপক পদ থেকে ২০০৯ সালে অবসর নেন। সপ্তদশ শতাব্দীর ব্রিটিশ বিজ্ঞানী স্যার আইজ্যাক নিউটন পদে ছিলেন। পরে সেখান থেকে হকিং অক্সফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের তাত্ত্বিক জ্যোতির্বিদ্যা মহাজাগতিক বিদ্যা পড়াতে যান। রয়্যাল সোসাইটি অব আর্টসের সম্মানীয় ফেলো এবং পন্টিফিকাল একাডেমি অব সায়েন্সের আজীবন সদস্য ছিলেন তিনি। হকিং ১৯৬৫ সালে জেন ওয়াইল্ডকে বিয়ে করেছিলেন। লুসি, রবার্ট টিম নামে দম্পতির তিন সন্তান আছে। ২৫ বছর একসঙ্গে থাকার পর তাদের বিচ্ছেদ হয়। পরে তিনি এলাইন ম্যাসন নামে এক সেবিকাকে বিয়ে করেন। তবে সম্পর্কও ভেঙে যায়। হকিং জেন ওয়াইল্ডের প্রেমকাহিনী নিয়ে তৈরি হয়দ্য থিওরি অব এভরিথিংচলচ্চিত্রটি। ২০১৩ সালে হকিংকে নিয়ে তথ্যচিত্রহকিংনির্মিত হয়।

*১৯৮৮ সালে স্টিফেন হকিংয়েরঅ্যা ব্রিফ হিস্ট্রি অব টাইম ফ্রম দ্য বিগ ব্যাং টু ব্ল্যাকহোলস প্রকাশিত হয়। বিশ্বজুড়ে আজ পর্যন্ত এক কোটি কপিরও বেশি বিক্রি হয়েছে। বিজ্ঞানের দুরূহতম বিষয়ের এমন সহজবোধ্য বই পর্যন্ত প্রকাশিত হয়নি বলে ধারণা করা হয়। স্টিফেন হকিং বিজ্ঞানকে সহজ করে ব্যাখ্যা দিতে সিদ্ধহস্ত ছিলেন। অ্যা ব্রিফ হিস্ট্রি অব টাইম বইটি তার জ্বলন্ত প্রমাণ। এছাড়াও তিনি লিখেছেন অন্যান্য অনেক জনপ্রিয় বই। মেয়ে লুসির সঙ্গে লিখেছেন, ‘জর্জ সিক্রেট কি টু ইউনিভার্স’, যেখানে হ্যারি পটারের স্টাইলে বিজ্ঞানের জটিল বিষয় তুলে ধরা হয়েছে।

বিশ্বখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং আর নেই। ২০১৮ সালের ১৪ই মার্চ বুধবার ভোরে ক্যামব্রিজের নিজ বাড়িতে মারা যান তিনি। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৭৬ বছর। স্টিফেন হকিং ১৯৪২ সালের জানুয়ারি যুক্তরাজ্যের অক্সফোর্ডে জন্মগ্রহণ করেন। তার জন্ম হয় মহান বিজ্ঞানী গ্যালিলিও গ্যালিলির মৃত্যুর ৩০০ বছর পর। আর বুধবার তার মৃত্যুর দিন মহাবিজ্ঞানী আলবার্ট আইনস্টাইনের জন্মদিন।

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Show Buttons
Hide Buttons
%d bloggers like this: