ভূমিকম্প ও বাংলাদেশ প্রসংগ

ভূমিকম্প ও বাংলাদেশ প্রসংগ: মুল লেখনীটি প্রদীপ কুমার সেন গুপ্ত এর  অনুমতিক্রমে   ফেসবুক প্রফাইল থেকে সংগৃহীত ও পুনরায় সম্পাদিত।

যদিও আমরা মনে করছি বাংলাদেশ ভুমিকম্প দুর্যোগে তুলনা মুলক ভাবে কম ঝুকিতে  রয়েছে। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে এটা মনে করার কিছু  কারন রয়েছে কারন সম্প্রতি বড় কোন ভুমিকম্প আঘাত করেনি বলে।

colorgeo
ফটো; ন্যাচার জিও সাইন্স

সংক্ষিপ্ত ও সহজ ভাবে ভূমিকম্প ও বাংলাদেশে এর প্রভাব সম্পর্কে কিছু বলার চেষ্টা করছি। মূলত: এটা একটা গণসচেতনতা মূলক সংকলিত ‘পপুলার আর্টিক্যল’।

ভূমিকম্প বা Earthquake কি?

প্রাকৃতিক কারনবশত ভূআলোড়নের ফলে ভূপৃষ্ঠের কোনো কোনো অংশে হঠাৎ কম্পনের সৃষ্টি হলে তাকে ভূমিকম্প বা Earthquake বলে। এই কম্পন প্রচন্ড, মাঝারি বা মৃদু আকারের হতে পারে। অনেক সময় সমুদ্রের তলদেশেও এ ধরনের ভূকম্পন হতে পারে। তখন যদি প্রচন্ড জলোচ্ছাস হয়, এটাকে তখন সুনামী বা Tsunami বলে।

সাধারনত: তিন ধরনের ভূমিকম্প হতে পারে, যেমন টেকটনিক ভূমিকম্প, অগ্ন্যুৎপাত জনিত ভূমিকম্প এবং মানব সৃষ্ট ভূমিকম্প ( যদিও বিরল)। পৃথিবীর অধিকাংশ ভূমিকম্পেরই প্রধান কারন ‘প্লেট টেকটনিক’। তাই ‘প্লেট টেকটনিক’ কি, তা আমাদের জানা দরকার।

প্লেইট টেকটোনিক (PlateTechtonic) কি?

প্লেইট টেকটোনিক হল, পৃথিবীর উপরিভাগকে বৃহৎ ও ক্ষুদ্র খণ্ডে বিভক্ত প্লেট এর ভু গর্ভে  অবস্থিত অধিক  ঘনত্বের তরল সাদৃশ্য ম্যাগমার উপর দিয়ে চলমান বিদ্যা কে বুঝায়।

প্লেইট টেকটোনিক (PlateTechtonic) তত্ত্ব অনুসারে পৃথিবীকে সাতটি প্লেইটে ভাগ করা হয়েছে।  প্লেট গুলো হল; ১) ইউরেশিয়ান  প্লেট ২) ঊত্তর আমেরিকান প্লেট ৩) প্যাসিফিক প্লেট ৪)   অস্ট্রেলিয়ান প্লেট ৫)  দক্ষিন আমেরিকান  প্লেট ৬) আফ্রিকান প্লেট  ও ৭) আন্ট্রারটিক প্লেট।   এবং বেশ কিছু ছোট ছোট প্লেইট  রয়েছে  যেমন  ইন্ডিয়ান প্লেট,  আরাবিয়ান প্লেট, কারিবিয়ান প্লেট, নাযকা প্লেট, ককস প্লেট, ও ফিলিপিন প্লেট।   প্লেট গুলোর গড় পুরুত্ত্ব ১০০ কিলোমিটার। প্লেট গুলো ভূপৃষ্ঠ  থেকে ভূগর্ভের নীচে কঠিন শিলা থেকে নমনীয় পাথর পর্যন্ত বিস্ত্রিত। ভুগর্ভের আর অধিক গভীরে গেলে অধিক  ঘনত্বের তরল সাদৃশ্য পাথর যাকে ম্যাগমা বলে, এর উপর ভেসে আছে এবং চলমান রয়েছে।   এই ম্যাগমা যখন আগ্নেয়গিরি র উদ্গিরনের মাধ্যমে ভু পৃষ্ঠে বের হয়ে আসে তখন থাকে লাভা বলে।  সাগর ও মহাদেশ নিয়ে এই প্লেইট ও সাব প্লেইট গঠিত। এরা সব সময় চলমান ও পাশাপাশি থাকার কারনে এরা কখনো ধাক্কা খাচ্ছে (Colliding), কখনো দূরে চলে যাচ্ছে (Spreading), কখন একটা আর একটার উপরে বা নিচে চলে যাচ্ছে (Subducting)। এ কারনে প্লেইট গুলোর প্রান্তিক অংশে ভূভাঁজ (Fold), চ্যূতি (Fault), অগ্ন্যৎপাত (Volcanic activities) গিরিগঠন (Mountain building), ভূমিকম্প (Earthquake), সমুদ্র তলদেশে সুনামী (Tsunami) ইত্যাদি হয়ে থাকে।

ভূ-গর্ভের যে স্থানে ভূমিকম্পের উৎপত্তি হয়, তাকে ভূমিকম্পের কেন্দ্র (Hypocentre/ Focus) বলা হয়। কেন্দ্র থেকে লম্বালম্বি ভূ-পৃষ্ঠের উপরিস্থ বিন্দুকে অপকেন্দ্র (Epicentre) বলে। ভূমিকম্পের স্পন্দন কেন্দ্র থেকে তরঙ্গের মতো চারদিকে ছড়িয়ে পড়ে। সিসমোগ্রাফ (Seismograph) যন্ত্রের সাহায্যে ভূকম্পন তরঙ্গ চিহ্নিত করা হয়।

ভূমিকম্পের মাত্রা দু-ভাবে নির্ধারণ করা হয়-

১) তীব্রতা (Magnitude):

এটি সাধারণত রিখ্টার স্কেলে মাপা হয়। এই স্কেলের মাত্রা হলো ১ থেকে ১০।
মাত্রা ৮ এর বেশী হলে ভূমিকম্পকে অত্যন্ত ভয়াবহ (Great), ৭ থেকে ৭.৯ কে মেজর (Gajor), ৬ থেকে ৬.৯ কে ব্যাপক (Large) বলা হয়। এখানে উল্লেখ্য যে, মাত্রা ৫ এর বেশী হলেই সমূহ বিপদের আশংকা থাকে। রিখ্টার স্কেলের মাত্রা ১ বৃদ্ধি পেলে ভূকম্পনের শক্তি ১০ থেকে ৩০ গুন বৃদ্ধি পায়।

২) ব্যাপকতা (Intensity):

এটি সাধারণত সংশোধিত মার্কেলি স্কেলে মাপা হয়, যা রোমান সংখ্যায় I থেকে XII পর্যন্ত। ক্ষয়- ক্ষতির ব্যাপকতা নির্দেশ করে এই স্কেলে মাপা হয়। যেমন ভয়াবহ (Violent), প্রচন্ড ( Severe), মাঝারি (Moderate), মৃদু (Mild) ইত্যাদি।  ভুমিকম্পের ব্যাপকতা ভুমিকম্পের কেন্দ্র থেকে দূরত্ব বৃদ্ধির সাথে সাথে কমতে থাকে অর্থাৎ কেন্দ্র থেকে যে যত দূরে অবস্থিত সে তত কম ভুমিকম্প অনুভব করবে। ক্ষয় ক্ষতি ও কম হবে।

বাংলাদেশ বা পশ্চিম বাংলায় সচরাচর ভূৃমিকম্প হয় না, তবে ভূতাত্ত্বিক অবস্থান ও ভূমিকম্পের ইতিহাস পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায় যে, এই অঞ্চলটি একটি ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকা। বাংলাদেশ ও পশ্চিম বাংলা ইন্ডিয়ান প্লেট, টিবেট প্লেট ও মায়ানমার প্লেট- এই তিনটি প্লেটের ত্রিমূখী সংযোগ স্থলের পাদদেশে অবস্থিত। ত্রিমূখী প্লেট সঞ্চালনের কারনে বাংলাদেশের উত্তরে, উত্তর পূর্বে ও পূর্বে বেশ কয়েকটি বড় ভূমিকম্প অতীতে সংগঠিত হয়েছে। বাংলাদেশের ভূপৃষ্ঠে ও ভূঅভ্যন্তরে অনেক গুলো ভূচ্যূতি রয়েছে, যা ভূমিকম্পের জন্য যথেষ্ট উপযোগী। সম্প্রতি   নাচার   জিও সাইন্সের  এক গবেষনায় দেখা গিয়েছে  যে, গত ৪০০ বছরে ঐ প্লেট গুলোর সঞ্চালনের  জন্য সঞ্চিত শক্তি এমন এক পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছে যে, অতি নিকটে যে কোন সময় সঞ্চিত শক্তি অবমুক্তি হয়ে  ৮  মাত্রার ও অধিক বড় ধরনের ভুমিকম্প হতে পারে বাংলাদেশ সহ পার্শ্ববর্তী দেশে। বাংলাদেশের   জন বহুল ঢাকা শহর এজন্য অধিক ঝুকিতে আছে  বলে সতর্ক  করে দিয়েছেন  গবেষকরা।

ভূমিকম্প প্রবণতা বিচার করে বাংলাদেশকে তিনটি অঞ্চলে ভাগ করা হয়েছে। জোন-১: অধিক ভূমিকম্প প্রবণ, জোন-২: মাঝারি ভূমিকম্প প্রবণ এবং জোন-৩: কম ভূমিকম্প প্রবণ এলাকা।colorgeo

কিভাবে ভুমিকম্প থেকে আমরা ঢাকা বাসি রক্ষা পেতে পারি?

বাংলাদেশের অন্যান্য জেলার তুলনায় ঢাকা শহর বেশি ঝুকিতে কারন অপরিকল্পিত  ইমারত।  ভূমিকম্প একটি ভয়াবহ দূর্যোগ। ভূমিকম্প যে কোনো সময়, যে কোনো অঞ্চলে আঘাত হানতে পারে। তাই এ বিষয়ে গণসচেতনতা গড়ে তোলা দরকার। ভূমিকম্পের কারনে ক্ষতি থেকে রক্ষা পাওয়ার উপায়, ভূমিকম্পের আগে, ভূমিকম্পের সময় ও ভূমিকম্পের পর আমাদের কি করা উচিৎ, তা প্রতিটি নাগরিকের জানা বিশেষ ভাবে প্রয়োজন।  ঢাকা শহরের প্রতিটা ইমারত নিবিড় পর্যবেক্ষণ করে  ঝকি পূর্ণ ইমারত গুলোকে ভুমিকম্প সহনীয় করে রেট্রফিটিং করতে হবে। তবেই  এর মরন আঘাত  থেকে আমরা বাচতে পারব। আমাদের শহর গুলোতে কোন বিল্ডিং এ আগুন লাগলে যেমন আমরা বিশাল ক্ষতির সম্মূখীন হয়ই। আর যদি ৭-৮ মাত্রার ভূমিকম্পের মতো দূর্যোগ নেমে আসে তবে যে ক্ষয় ক্ষতি হবে তা সামাল দেওয়া আমাদের মতো দেশের পক্ষে কঠিন হবে। তাই, আসুন আমরা ভূমিকম্পের ব্যাপারে সচেতন হই।

colorgeo
ভুমিকম্প সহনীয় Retrofitting করা ইমারত।

রেফারেন্সঃ https://www.nature.com/articles/ngeo2760

আরও পড়ুনঃ

আমেরিকানরা ১৫০০০ বছর আগে প্রথম বসবাস শুরু করেছিল: ডিএনএ টেস্ট এ প্রমান

মন্তব্য করুন

আপনার ই-মেইল এ্যাড্রেস প্রকাশিত হবে না। * চিহ্নিত বিষয়গুলো আবশ্যক।

Show Buttons
Hide Buttons
%d bloggers like this: